
প্রবল বৃষ্টিতে কলকাতার রাস্তা দেখতে ভারি ভালো লাগে। রাস্তায় অল্প জল জমলেও আমার খারাপ লাগে না। সে অনেকদিন আগেকার কথা। তখনও আমার ছাত্রজীবন শেষ হয়নি। সেই রকম এক বৃষ্টির দিনে রাস্তার জলে ভেসে যাচ্ছিল এক জ্যান্ত বেড়ালছানা। দৌড়ে গিয়ে ধরলাম। তারপর নিয়ে এলাম বাড়িতে তুলে। বাবা-মা আমাকে গালি দিতে দিতে বেড়ালটাকে সেবাযত্ন করলেন।
সেই বেড়ালের নাম রাখা হল ভেনিস। হুলো বেড়াল। সার পাড়া ভেনিসের ভয়ে কাঁপত। মানে পাড়ার বেড়ালরা কাঁপত। ছোটোখাটো অনেক কুকুরও ভেনিসকে ভয় পেত।
অথচ এই ভেনিস কলকাতার রাস্তায় ভেসে যাচ্ছিল এক বৃষ্টিমুখর দুপুরে; আমি যদি ঠিক সেই মুহূর্তে রাস্তার দিকে না তাকিয়ে আকাশ দেখতাম তাহলে ভেনিসের বড়ো হওয়া হত না।
সেই ভেনিস একদিন বুড়ো হয়ে পৃথিবীর বাইরে যে দেশ সেখানে চলে গেল। বৃষ্টি পড়লে মাঝেমাঝে মনে পড়ে ভেনিসের কথা। ঠিক এক সেকেণ্ডের মধ্যে ভেনিসকে জল থেকে না তুললে ও মরে যেত। জীবনটা ভেনিসেরই মতো। এক লহমায় শুরু বা শেষ। বৃষ্টির এপ্রান্তে থাকব নাকি বৃষ্টির দেওয়াল ভেদ করে অন্য প্রান্তে চলে যাব সে কথা বড়োই অনিশ্চিত।
একবার মুষলধারে বৃষ্টি। আমরা সুনীলদার সঙ্গে কোলাঘাটে গিয়েছিলাম। বুধসন্ধ্যা বলে একটা ক্লাব ছিল কলকাতায় বহু বছর। সেখানে মূলত আমোদপ্রমোদ হত। প্রতিবছর কোনো এক বৃষ্টির দুপুরে সেখানে হত ইলিশ দুপুর বলে এক উৎসব। মদ এবং ইলিশ আর ফূর্তি ছিল সেই উৎসবের উদ্দেশ্য।
সেইবছর ইলিশ দুপুর পালন করতে আমরা গিয়েছিলাম কোলাঘাটে।
একজন কোনো সরকারি পদস্থ কর্তা, যিনি বুধসন্ধ্যারও সদস্য ছিলেন, তিনি কোলাঘাটে একটা সরকারি বাংলো ব্যবস্থা করেছিলেন। সেই সময় সরকারি বাংলোগুলো রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে মনে সন্দেহ থাকত, কিন্তু এই বিশাল বাংলোটি প্রায় মধ্যযুগের লন্ডনের মতো সুন্দর। কারণ কী জানি না , তবে খুবই সুসজ্জিত ছিল সেই পান্থনিবাস। সুনীলদা গিয়েই পাঁচ মিনিটের মধ্যে শিশি বোতল খুলতে নির্দেশ দিলেন। আমরা জনা তিরিশ লোকজন ছিলাম। বাংলোর কেয়ারটেকার একটু যেন ভুরু কুঁচকে কিছু ভাবলেন। তারপর একটা ফোন করবার দরকার বলে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন।
সুনীলদা গান ধরলেন। বৃষ্টি এল গভীর ধারাপাতে। এমন সময় ফিরে এলেন সেই রোগাসোগা কেয়ার টেকার, সঙ্গে একজন খুব লম্বা চওড়া মোটা লোক।
কেয়ারটেকার জানালেন, ‘এখানে ড্রিংক করা যাবে না। পারমিশন নেই।’
অনেকে এবার একসঙ্গে বললাম, ‘সেকি !’
কেয়ারটেকার বললেন, ‘আপনারা সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করবেন বলে এসে তারপর এই করছেন। এই হল সুনীল গাঙ্গুলির আসল রূপ ! ওপেনলি ছেলেমেয়ে একসঙ্গে ড্রিংক করছেন। ছি ছি। এখানে পারমিশন নেই। ড্রিংক করা যাবে না।’
আমাদের সঙ্গে ছিলেন তরুণ চট্টোপাধ্যায়। তিনি মদ সম্পর্কে অনেক খবর রাখতেন, তিনি বিনীত ভাবে বললন, ‘খোলা জায়গা তো নয়, এখানে তো ঘরের মধ্যে আমরা খাচ্ছি। কী সমস্যা হচ্ছে? এটা বে-আইনি নয়।’
সৌমিত্র মিত্র ছিলেন, তিনি পদস্থ সরকারি আধিকারিকও বটে। তিনি বললেন, ‘কে পারমিশন দেবে? আমি কথা বলছি চলুন কাকে ফোন করতে হবে।’
কেয়ারটেকার অটল। তিনি বললেন ‘আপনাদের আমরা আলাউ করব না। এখুনি আপনারা চলে যান। আপনাদের এখানে থাকা হবে না। কিছুতেই নয়। বেরিয়ে গিয়ে যাকে খুশি ফোন করুন। এখানে এসব চলবে না।’
বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এমন বৃষ্টিতে তো গাড়ি চালিয়ে কোথাও যাওয়াও খুব কঠিন। বেরিয়ে যেতে বলছে। কী হবে এবার !
সুনীলদা ইতিমধ্যেই তিন পেগ শেষ করেছেন। সুনীলদার পেগ মানে, পাতিয়ালা পেগ। এক পেগ মানে আড়াই পেগ ধরা যায়।
সুনীলদা লোকটাকে এতক্ষণে বললেন, ‘অ্যাই, তুমি কী খেতে চাও? তাহলে তোমাকেও দেওয়া হবে।’
কেয়ারটেকার জানালেন, ওঁরা মদ খান না। এখুনি যেন আমরা বেরিয়ে যাই।
তখন সুনীলদা প্রবল ধমকে বলে উঠলেন, ‘আমাদের এসব বলে লাভ নেই। এখানেই আমরা থাকব। মদও খাব। কোথাও যাব না। ডাকো যাকে ডাকবে। ডাকো তোমাদের মুখ্যমন্ত্রীকে। যা পারো করো।’
সবাই ওদের বলতে লাগল, ডাকো ডাকো যাকে ডাকবে ডাকো। পরে শুনেছিলাম ওঁরা থানায় ফোনও করেছিলেন। পুলিশ একেবারেই নিষ্ক্রয় ছিল। এমন বৃষ্টি হয়েছিল যেন পুরো পৃথিবীটাই ডুবে যাবে।
বৃষ্টির দিনে এসব কথা মনে পড়ে। জীবন যেন বৃষ্টির জলে দালানে লেখা নামের মতোই। নিমেষে ফুটে ওঠে, নিমেষে মুছে যায়।
মনে পড়ে যায় কলেজে বৃষ্টির দিনে প্রথম বার ক্লাস পালানো, বৃষ্টির ইলিশ দুপুর। মনে পড়ে ছোটোবেলায় গঙ্গার ধারে বাড়ি থেকে বৃষ্টির দিনে গঙ্গাকে দেখে ভয় লাগত একটু। এখনও সেই গঙ্গার কথা মনে পড়লে বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে। আবার বৃষ্টিমুখর গঙ্গার পাড় টানেও খুব। গঙ্গার জলে যখন বৃষ্টি পড়ে সেই গঙ্গাও খুব টানে আজকাল। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন যেমন কূল থেকে অকূলে ভেসে যাওয়া তেমনই তো যেতে হবে এবার। এইসব কথা মনে হয় বৃষ্টির দিনে।