
ট্রাক চালাচ্ছিলেন বাঙালি তরুণ কেশব। না, শখ করে নয়, পেটের তাগিদে। হঠাৎ হেডলাইট খারাপ হয়ে গেল। কুছ পরোয়া নেই। খালাসি একটা হ্যারিকেন জ্বালিয়ে উঁচু করে ধরে রাখল। সেই আলোতে পথ দেখে এগোতে লাগল ট্রাক। হ্যাঁ, ঠিক এরকমই তাঁর ইচ্ছাশক্তি। কেশব কুমার হালদার, হালদার ভেঞ্চার লিমিটেড-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর। শুধু ট্রাক চালানো কেন, কম বয়স থেকেই জীবিকার লড়াইয়ে জীবনের আরও অনেক রূঢ় দিক দেখেছেন। 'জানেন, ছোটোবেলায় দাদু কী গল্প বলতেন? মানুষের ব্যর্থতার গল্প। আত্মীয়, পরিচিত জনেরা কী কী ভুল করেছে, যেজন্য সফল হতে পারেনি, সেই কাহিনি। তখন থেকে জেনেছি, ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে হয়।' জানালেন, তাঁর জীবনে আর এক বড়ো শিক্ষক মা। চরম বিপদেও যাঁকে কোনোদিন ভেঙে পড়তে দেখেননি। 'কত ধানে কত চাল', সেই ছেলেবেলায় বুঝেছিলেন বলেই আজ ব্যবসার এই সোনালি দিনেও কেশব কুমার হালদারের পা রয়েছে মাটিতেই।
১৯২৪ সালে বীরভূমের রামপুরহাটে বৃন্দাবন চন্দ্র হালদারের হাতে যাত্রা শুরু বাংলায় কৃষিপণ্য ব্যবসার অন্যতম পথিকৃৎ বি সি হালদার রাইস অ্যান্ড অয়েল মিলস-এর। তাঁর যোগ্য উত্তরসূরী মদনমোহন হালদার, প্রভাত কুমার হালদারের হাত থেকে ব্যাটন গেছে কেশব কুমার হালদারের কাছে। তাঁর নেতৃত্বে তরতর করে এগোচ্ছে বাণিজ্যতরী, তৈরি হচ্ছে চতুর্থ প্রজন্ম।
'পাঁচটা বিষয়কে গুরুত্ব দিই আমি। এক, শিকড়ের টান না ভোলা। দুই, ক্রেতার চরিত্র বোঝা। তিন, পরের প্রজন্মকে তৈরি করা। চার, কর্পোরেট সেট আপ তৈরি করে যোগ্য লোকের হাতে ক্ষমতা দেওয়া। পাঁচ, সমালোচনা নিতে জানা।' সোজা ভাষায় স্বচ্ছ ধারণা দিলেন কেশব কুমার হালদার।
ঠিক এরকমই সরলরেখায় উত্থান হালদার ভেঞ্চার লিমিটেড-এর। ১৯২৪ সালে প্রতিষ্ঠা। ’৯৫ সালে রাইস মিল ঢেলে সাজানো, ২০১১ সালে রাইস ব্র্যান অয়েল প্ল্যান্ট। দুবছর পরেই বিশ্ব জুড়ে চাল রপ্তানি শুরু। এরপর বড়ো পদক্ষেপ বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে নথিভুক্তি। ২০১৮ সালে ওডানা ভোজ্য তেল এল পশ্চিমবঙ্গ আর উত্তর পূর্ব ভারতের বাজারে। ২০২৩ সালে সয়াবিন আর সানফ্লাওয়ার অয়েল উৎপাদন শুরু করল হালদার ভেঞ্চার লিমিটেড।
কেশববাবুকে একটা প্রশ্ন না করে পারলাম না। 'বাঙালির ব্যবসা যখন একটার পর একটা বন্ধ হয়ে গেছে, তখন ঠিক কোন জাদুতে শতবর্ষ ছুঁল হালদার ভেঞ্চার লিমিটেড?' স্ট্র্যান্ড রোডে দোতলার অফিসে তাঁর চেম্বারের কাচের দেওয়ালের ওপারে বিস্তীর্ণ গঙ্গায় চোখ রেখে বললেন, 'আমার পূর্বসূরীরা স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন এমন একটা দিনের, যেদিন সব মানুষের মুখে পুষ্টিকর খাদ্য তুলে দেওয়া যাবে। সমাজের সব স্তরের লোক স্বাস্থ্যকর খাবার পাবে। আমাদের মিশন বলুন কী ভিশন, মানুষের ভালো করা, দেশের উন্নতিতে কিছু অবদান রাখা, এটাই প্রধান।'
পূর্ব ভারতের মানুষ সিদ্ধ চাল খেতে অভ্যস্ত। আসলে আমিষ পদের সঙ্গে সিদ্ধ চালের ভাত স্বাদ বাড়ায়। আপাতত বারো রকম ব্র্যান্ডের চাল বাজারে আনার ব্যাপারে কাজ চলছে বলে জানা গেল। উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে জোরকদমে, কারণ আরো বেশি রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। আফ্রিকা, রাশিয়া, বাংলাদেশ, সিঙ্গাপুরের পর এবার লক্ষ্য ইউরোপ, আমেরিকা।
কেশববাবুর কাছে শেষ প্রশ্ন ছিল, 'আপনাদের সংস্থা সেভাবে প্রচারের আলোয় আসেনি এতদিন। একশোয় পা দেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল কেন?' তাঁর সোজাসাপ্টা জবাব, 'ঘরের মার্কেটে ব্র্যান্ডিং নিয়ে ভাবিনি এতদিন। বিদেশের বাজার ধরায় জোর দিয়েছি। এবার জাতীয় পর্যায়ে ব্যবসা বাড়ানোর লক্ষ্যে এগোচ্ছি। শতবর্ষ একটা বড়ো ঘটনা, সেলিব্রেট করার মতো। আমার শক্তি যারা, পরিবারের সবাই আর সহকর্মীদের নিয়ে আনন্দ করছি।'