তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
বাংলা গানের উত্তমকুমার

 

                 

উত্তমকুমারের মৃত্যুর পর স্টুডিয়োতে তাঁর স্মরণসভায় উত্তমকে স্টার হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায়। তিনি বলেন,‘বাংলা সিনেমার একমাত্র স্টার হলেন উত্তম।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলা সিনেমায় অনেক নায়ক আছেন, তাঁদের অনেকেই ভালো অভিনয় করেন, কিন্তু উত্তমের মতো কেউ নেই, উত্তমের মতো কেউ হবে না।’ আশ্চর্য ! উত্তমের জায়গায় শুধু হেমন্ত বসিয়ে দিন, সিনেমার জায়গায় গান, দেখবেন হেমন্তর ক্ষেত্রেও কথাগুলো সমানভাবে সত্য হয়ে উঠবে। বাংলা গানের জগতেও হেমন্ত তো স্টার-ই। হেমন্তের মতো কেউ নেই, হেমন্তর মতো আর কেউ হবেনও না। কিন্তু স্টার তো কেউ একদিনে হয়ে ওঠেন না। স্টার বা তারকা নির্মাণের একটা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে। একটা সময়ে এক-একটা মাধ্যমে এক-একজন তারকাই নির্মিত হন। আর এর পেছনে এক আর্থ- সামাজিক পরিবেশ কাজ করে। হেমন্ত যখন গানের জগতে আসছেন তখন বাংলার অবস্থাটা দেখা যাক। দেশভাগ-মন্বন্তর-দাঙ্গা পেরোনো একটা জাতি, বাড়ি ঘর ইজ্জত সব খোয়ানো এক উদ্‌বাস্তু স্রোত, সামনে যাঁদের কোনো দিশা নেই, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে প্রাত্যহিক জীবনযাপন। এই রকম একটা জাতির সামনে একটা স্বপ্নের খুব দরকার ছিল। সিনেমায় সেই স্বপ্ন নিয়ে আসেন যেমন উত্তম, তেমনি দিশাহারা এই জাতির সামনে গানে সেই স্বপ্ন নিয়ে আসেন হেমন্তই। গানের মাধ্যমে সব হারানো এক জাতির সামনে নিজের ঐশ্বরিক কন্ঠের মধ্যে দিয়ে এক স্বপ্নের কল্পলোক তৈরি করে দেন তিনি।

 

কণ্ঠই তাঁর জাদু। আর তার সঙ্গে অবশ্যই যোগ দেব প্রতিভা। এই দুয়ের যোগাযোগেই তিনি হয়ে উঠলেন জাতির আইকন। বাংলা সংগীত দুনিয়ার স্টার। এবং প্রায় তারই সমান্তরালে নির্মিত হল আর এক স্টার উত্তমকুমার। তিনিও হয়ে উঠলেন দিশাহারা জাতির দিশা। এবং উত্তম-হেমন্তর যুগলবন্দি তো সোনায় সোহাগা ! দুজনে ইতিহাসের এক অধ্যায় গড়লেন। নিজেদের অজান্তেই বুঝতে পারছিলেন সব কিছু। ভিটেমাটি খুইয়ে,  ইজ্জত খুইয়ে সদ্য স্বাধীন হওয়া একটা জাতির আশা-আকাঙক্ষাই ছিল অন্যরকম। ট্রেন-ভরা শরণার্থী, ছিন্নমূল পরিবার আর 'ফ্যান দাও' ডাকের স্মৃতি যখন জাতির মগজে দগদগ করছে, তখনই উত্তম- হেমন্ত এলেন। দেবদূত যেন দুজন। শুরু হল বিনোদনের জগতে এক রূপকথা। আর এই রূপকথার ফ্যান্টাসি সাদরে আঁকড়ে ধরল সব হারানো এক জেনারেশন। হেমন্ত-উত্তম যুগের শুরু অবশ্যই এই সূত্র ধরেই। দুজন দুজনকে জনপ্রিয়তা দিয়েছেন।

আর একটা কথা, আপামর বাঙালির মধ্যে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে জনপ্রিয় করেছেন সেই  হেমন্তই।

 ব্যক্তিগতভাবে হেমন্তর সঙ্গে সাংবাদিকসুলভ আলাপের বাইরে আমার আলাপের সীমানাটা হয়ে উঠেছিল অনেক আন্তরিক। মেনকা সংলগ্ন ফ্ল্যাটে অবাধ প্রবেশাধিকার ছিল। ঠিক প্রথাগত সাক্ষাৎকার না হলেও তাঁর মুখে নানা সময়ে কথাবার্তার স্মৃতি এখনও আমার মনে রয়ে গেছে। তবে উত্তম প্রসঙ্গ উঠলে তিনি আশ্চর্যজনকভাবে নীরব হয়ে যেতেন। অথচ উত্তমকুমার উত্তমকুমার হয়ে ওঠার অনেক আগে থেকেই তাঁর সঙ্গে উত্তমের পরিচয়। তখন উত্তম হলেন অরুণ। এসব কথা অবশ্য আমার জানা উত্তমের কাছ থেকেই। ছোটোবেলায় প্রায় পাশাপাশি পাড়ায় থাকতেন তাঁরা। আসতে যেতে দেখা হত, ঠিক পরম বন্ধুত্ব না হোক চেনাজানা তো ছিলই। বরং হেমন্তর মুখে বারবার উঠে আসত কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কথা। তাঁরা ছিলেন স্কুল-ফ্রেন্ডস। কবি সুভাষের বয়ান মতো হেমন্তকে নিয়ে স্কুলের ভেতরেই টিফিনে বসত গানের আসর। একের পর এক গান গাইতেন হেমন্ত। মিত্র ইনস্টিটিউশনের সেই দিনের সময় থেকেই কবি নিশ্চিত ছিলেন, হেমন্ত একদিন খুব বড়ো গায়ক হবেন। ‘কিন্তু আমার স্বপ্ন তখন সাহিত্যিক হবার, গায়ক হব কখনও ভাবিনি।' হেমন্ত আমাকে এক আলপচারিতায় এই কথা জানান। আবার এই কথাও বলেন, ‘সুভাষের প্ল্যান ও সক্রিয়তার জন্যেই আমার গায়ক হয়ে ওঠা। আমাকে প্রথমে রেডিয়োতে গান গাইবার সুযোগ করে দেওয়া, রেকর্ড করানো সব কিছুর পেছনেই ওই সুভাষ।' সাহিত্যিক হবার বাসনাকে অনেকটাই সার্থক করে তুলেছিলেন হেমন্ত। তাঁর গল্প ‘দেশ' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কিন্তু সুভাষ তাঁর মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন গানের ভবিষ্যৎ। এদিকে যাদবপুরে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভরতিও হয়েছিলেন হেমন্ত। কিন্তু তাঁর সাহিত্যিক হওয়া হল না, ইঞ্জিনিয়ার হওয়াও না, তিনি হয়ে উঠলেন বাংলার স্বপ্নের গায়ক। যাঁর আজ অবধি কোনো বিকল্প তৈরি হয়নি। তাঁর সঙ্গে একমাত্র আর এক বাঙালি স্বপ্নপুরুষেরই তুলনা করা যেতে পারে— তিনি  উত্তমকুমার।

  এটা অবশ্য মানতে রাজি ছিলেন না হেমন্ত, ‘আমার সঙ্গে তোমরা উত্তমের তুলনা কোরো না।’ ব্যাস এইটুকুই। উত্তম নিয়ে আর একটা কথাও নয়। উত্তম কিন্তু হেমন্ত উচ্চারণে দরাজ, ‘হেমন্ত কণ্ঠের কোনো বিকল্প হয় না। অন্তত আমার চলচ্চিত্র জীবনে, আমার প্রতিষ্ঠার পেছনে হেমন্ত কণ্ঠের অনেকটাই অবদান রয়েছে। আর তা ছাড়া যখন মন খারাপের দিন, হেমন্তর কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত আমার মন ভালো করে দেয়। টনিকের মতো কাজ করে।’ উত্তমের কথার সঙ্গে সকল বাঙালিই বোধহয় একমত হবেন। রবীন্দ্রসংগীত জগতে অনেক অনেক মহীরূহ শিল্পী রয়েছেন,  তবু এটা অবশ্যস্বীকার্য যে, বাঙালি জীবনে রবীন্দ্রসংগীতকে জনপ্রিয় করেছেন হেমন্তই। যেমন বাঙালি জীবনে বাঙালিয়ানাকে  উজ্জীবিত করেছেন উত্তম, তেমনই হেমন্ত --- বাঙালিয়ানা সূত্রে দুজনে যেন দুজনের পরিপূরক। একজন বাঙালিকে নতুন করে ধুতি পরা শেখাচ্ছেন, আর একজন বাঙালিকে ফিরিয়ে আনছেন সাদা হাফ শার্ট, ধুতি আর চটির সংস্কৃতিতে।


Scroll to Top