
চায়ের দোকানের সবচেয়ে জ্ঞানী লোকটা বলছিল, জামাইদের আর সে দিন কি আছে? এখন সব হেলে কার্তিকের মতো লোকজন জামাই সেজে হাজির হচ্ছে। ভার-ভাত্তিক ব্যাপারটাই উঠে গেছে দুনিয়া থেকে। আমি এ ব্যাপারে একমত। কোন বিষয়টাই বা আগের মতো আছে এখন? সবই ফঙ্গবেনে । হালকা-পলকা। সোনার দাম ঠেলে উঠেছে লাখের গোড়ায়। বিয়ে-ফিয়ে যে এখনো লোকে কচ্চে, সেটাই আশ্চর্য ! লিভ ইন-এর জামানা , হে ! পোষালে থাকো – না হলে, কেটে যাও ! তার মধ্যে, আবার জামাই ষষ্ঠী ! আর বছর’টাক বাদে, হয় তো, লোকে চিড়িয়াখানায় লুপ্তপ্রায় ‘সম্পর্কে’র হদিশ পেতে জামাই দেখতে যাবে ! সে যাই হোক, চায়ের দোকানে ফিরে আসি ! আমার মতো পুরনো ইস্কুলের লোকেদের চায়ের দোকানের প্রতি নাড়ির টান ! আজ পর্যন্ত, সেখেনে যত জ্ঞানগর্ভ আলোচনা শুনেছি, তেমনটি আর কোত্থাও না। ক্যাফে নামের ঠান্ডা ঘরে, কেউ কারো নয় ! সেখানে বিজনেস ডিল থেকে ব্রেকআপ-প্যাচআপ ইত্যাদি হয় বটে, কিন্তু চা দোকানের জিয়ন্ত কলজে সেখানে মেলে না। অচেনা লোকের সঙ্গে মনের কথা বলার আরাম যে না পেয়েছে, তাকে তা লিখে-বলে কিছুতেই বোঝানো যাবে নে।
সে যাকগে, হচ্ছিল জামাইদের নিয়ে কথা! বাঙালিদের মধ্যে, বা বলা ভালো ভারতীয় পরিবারে জামাইদের যা কদর তা দুনিয়ার আর কোথাও আছে বলে মনে হয় না। বঙ্গ দেশের জামাই ষষ্ঠী, জামাইদের ওয়ান ডে ম্যাচ বলে ধরে নেবেন না যেন ! এ একেবারে টেস্ট ম্যাচ। ইদানীং জামাই ষষ্ঠী যেন মিনি দুর্গাপুজো। এই উপলক্ষ্যে দোকান-বাজারে ছাড়ের বন্যা বইছে। ক্লাউড কিচেনে পপ আপের ঢল। শাশুড়ি, শ্বশুরের রান্নাঘর – বাজারের মধ্যে শাটল কর্কের মতো ছোটাছুটি করার দিন শেষ। জামাই আসা নিয়ে আজকাল আর কেউই বসে বসে জল্পনা করে না। খাওয়ানোর জন্য জোম্যাটো, সুইগি আছে। তাছাড়া জামাই নিয়ে বেশি আদিখ্যেতা করারও নানা বখেরা ইদানীং শুরু হয়েছে। । বছর বছর জামাই পালটে যাওয়ার যে রেওয়াজ শুরু হয়েছে তার চক্করে পড়ে মেয়ের বাপ-মায়েরা দিশেহারা। ওদিকে, জামাইরাও আর আগের মতো ধোয়া তুলসী পাতা নেই। শাশুড়িকে ‘দিদি’ বলে ডাকা জামাইকে কে আর পাঁচ ফল-মিষ্টির সিধে দেবে। গরদ দিয়ে পেন্নাম করা যে সব হাতে গোনা জামাই গত শতকের শেষের দিকেও ছিলেন, তাঁদের এখন শ্বশুরের পোস্টে প্রমোশন হয়েছে। তাঁরা পদে পদে গিন্নিকে চোখে আঙুল দিয়ে, নিজের শ্বশুরের জামাইয়ের তুলনায় আপন জামাই যে কতখানি নিরেস – তার বাখ্যা করছেন। আর ফায়দা লুটছে, ‘অথেনটিক বেঙ্গলি’ খাবারের রেস্তরাঁগুলো। তারা করলাভাজা, মোচার ঘন্ট, পুঁইশাক চচ্চড়ি বেচে কোটিপতি হচ্ছে। এ তবু মানা যায়, কিন্তু জামাইদের ‘বেঙ্গলি ফিউশন’ ফুড গেলানোর নামে আনারস দিয়ে পাঁঠা, দুধের সর দিয়ে মুর্গি, এলাচ দিয়ে পেঁপে, পোস্ত দিয়ে কাঁচকলা-র যে সব ভয়ানক পদ রাঁধা হচ্ছে – তার আশেপাশে থাকাও বিপজ্জনক। এ সব কেবল রেস্তরাঁ নয়, জামাইদের পাতে বসিয়ে তাক লাগিয়ে দিতে শালী-শাশুড়িদের হেঁশেলেও, রান্নার ব্লগের কল্যাণে তোয়ের হচ্ছে। ফুড ব্লগাররা মুখে ফেনা তুলে ফিউশন ডিশের কলা কৌশল জানিয়ে যাচ্ছেন। হালতুর লেবেল ক্রশিং থেকে এঁড়েদা-র বাসস্ট্যান্ড অব্দি যেখানে যত ‘অনবদ্য স্বাদ’-এর হোটেল আছে – সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ তুলে ধরছেন। তাঁদের বাণী শুনলে মনে হতে বাধ্য, ওই সব ঠেকে খাননি মানে আপনার নরকবাস গ্যারান্টিড। এসবের মধ্যে হীরের গয়নায় ডিসকাউন্ট দিচ্ছে জেনে, অত্যন্ত বিবেচক জামাই শুনিয়ে দিচ্ছে সোনার দাম বেশি বলে সে একখানা হীরের আংটি চায়। বিয়েতে কেবল সোনাতেই কাজ চালিয়ে নিয়েছিল বলে তার কি হীরের শখ থাকতে নেই কো?
চায়ের দোকানের লোকটা এসব গল্প শুনে বিচলিত হয় না। তার কেবল হা-হুতোশ জামাইদের চাল চলন নিয়ে। ইতিমধ্যে, একখানা ধুতি-পাঞ্জাবি শোভিত লোক, হাতে নাকে দড়ি বাঁধা ইলিশ নিয়ে এদিক পানে আসছে দেখে – সে প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে, তাকে ডেকে চা খেতে নিয়ে আসে।
আপনি কোন বাড়ি যাবেন আজ্ঞে?
বাড়ি না ফ্ল্যাট। অমরাবতী আবাসনে যাব।
- আচ্ছা আচ্ছা , এই তো সামনেই। এককাপ চা খেয়ে নিন। আমি দিয়ে আসছি।
লোকটি সন্দিগ্ধ স্বরে বলে, দাম দিতে হবে নাকি? ওরা তো আমাকে কাজের শেষে পেমেন্ট দেবে।
- পেমেন্ট? মানে? আরে, অমর দত্তের জামাই আজ আসতে পারবে না। এটা তার মেয়ের চার নম্বর বিয়ে। তাও বিলেতে। বাপ-মা এখনো জামাই দেখেনি। তা ওরা আমাকে একটা এজেন্সি থেকে ভাড়া করেছে। সেই জন্যে যাচ্ছি। কাজটা শেষ হলে, টাকা পাব।
জ্ঞানী লোকটার সিলেবাসে এ জিনিস তার ঠাকুদ্দারও জামাই- জন্মে না থাকায় সে চুপ করে গেল।
গল্পটা শুনে, আমার বাবার জামাই কেবল এজেন্সিটার নাম জানতে চাইছে।