
সাধারণ দর্শক সিনেমা দেখতে চায়, ডকুমেন্টারি ছবি বোরিং। সেখানে একটা তথ্যচিত্র যদি আলোড়ন ফেলে দেয় পৃথিবী জুড়ে, তাহলে তাকে অন্যরকম বলতেই হয়। ওটিটির কল্যাণে নিউ ইয়র্কে বসে একজন যা দেখছে, নবগ্রামে বসে সেটাই দেখছে আর একজন। তাই দাবানলের মত স্ক্রিন থেকে স্ক্রিনে ছড়িয়ে পড়েছে নেটফ্লিক্স ডকুমেন্টারি 'আমেরিকান ম্যানহান্ট: ওসামা বিন লাদেন'। মাত্র তিন এপিসোডে বিন্যস্ত ২০০১ সালের অভিশপ্ত ১১ই সেপ্টেম্বর থেকে পরবর্তী প্রায় দশ বছরের অনুসন্ধানের লড়াই। ফলে টানটান বুনন, একটা দৃশ্য, একটা সাক্ষাৎকার মিস করতে দেয় না। দুনিয়া কাঁপানো সন্ত্রাসী, আল কায়দার মেরুদন্ড ওসামা বিন লাদেনের খোঁজে হন্যে হয়ে অভিযানের পর অভিযান করছে আমেরিকার সরকার, সেনাবাহিনী আর সি আই এ। ঢুঁড়ে ফেলছে আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তান, নানা সম্ভাব্য হাইড আউট। কিন্তু ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে যাচ্ছে ধুরন্ধর লাদেন। অথচ মাঝেমাঝেই ভিডিও বার্তায় সে হুমকি দেয়, 'আরও খারাপ দিন আসছে'। অবশেষে এই ক্যুরিয়ারকে ফলো করেই পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদের উঁচু পাঁচিল ঘেরা সাদা বাড়িটির সন্ধান পেল মার্কিন মাল্টি এজেন্সি অনুসন্ধানী দল। ২০১১ সালের পয়লা মে মধ্যরাতে (সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী ২ মে) চূড়ান্ত অপারেশনে হেলিকপ্টার হানা দিল সিল টিম সিক্স। এবং লেখা হল লাদেন বধ কাব্য। দুটি কি তিনটি গুলি খরচ হয়েছিল সামনাসামনি এই মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গি নেতাকে মারতে। যে অফিসার মারলেন, তিনি সাক্ষাৎকারে বললেন, 'হঠাৎ সামনে দেখি, হ্যাঁ, সত্যিই তো ওসামা বিন লাদেন। গুলি করলাম।' দুটি গুলি সোজা মাথায়। এরপর বডি ব্যাগে ভরে হেলিকপ্টারে করে নৌবাহিনীর জাহাজ, সেখান থেকে আরব সাগরে নিক্ষেপ। যতক্ষণ না হেলিকপ্টার পাকিস্তানের আকাশসীমা পেরিয়ে আফগানিস্তানে ঢুকছে, সাঙ্ঘাতিক টেনশন। যে কোনও মুহূর্তে গুলি করে নামাতে পারে পাক বাহিনী। চিরকাল সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়দাতা যে পাকিস্তান, জানে গোটা পৃথিবী।

লাদেন নিধনের এই জানা ঘটনাকে প্রায় থ্রিলারের দমবন্ধ করা স্ক্রিপ্টে রূপান্তর করা সহজ কাজ নয়। অথচ কোথাও একফোঁটা বাড়াবাড়ি নেই। না অতি নাটকীয়তা, না সিনেমাটিক কায়দায় গল্প বলা, একেবারে তথ্যচিত্রের ব্যাকরণ মেনে ঘটনা পরম্পরা গাঁথা, মূলত সেই সময়ের সি আই এ, সেনা বা সরকারি আধিকারিকদের সাক্ষাৎকার আর কিছু দুষ্প্রাপ্য ফটো অথবা ভিডিও ক্লিপিংস-এর সুতোয়। এর ফাঁকে ফাঁকেই দেখানো হয়েছে, বারবার ব্যর্থতার দায়ে মাথা নুয়ে যাচ্ছে অনুসন্ধানী টিমের, আমেরিকা তো বটেই, গোটা বিশ্ব আস্থা হারিয়েছে তাদের ওপর, গোপন অভিযানের চাপে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন দক্ষ অফিসারেরা, বুশ থেকে ওবামা- বদলে গেছেন প্রেসিডেন্ট, তবু পাখির চোখ রয়ে গেছে অপারেশন লাদেন।
এই তথ্যচিত্রে একটা ব্যাপার নাড়িয়ে দিয়েছে - খুব সাবলাইম ভঙ্গিতে আবহ সঙ্গীতের মত যা রাখা হয়েছে ছবিটি জুড়ে। একটা চাপা কষ্ট ছড়িয়ে আছে - প্রায় দশ বছরের অভিযানের কোনও গুরুত্বপূর্ণ তারিখ যতবার ভেসে উঠেছে পর্দায়, ততবার নিচে লেখা হয়েছে, ৯/১১ থেকে এতদিন পর। আসলে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন পরিচালক জুটি মোর লাউশি- ড্যানিয়েল সিভান, 'যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই শয়নে স্বপনে'। এই মোটিভেশনই যুগে যুগে অসুর দমনের চাবিকাঠি।