
বর্ষা মানে বিরহে কাতর যক্ষকে নিয়ে বিষণ্ণ থাকার সে একটা দিন গেছে। বর্ষা, মানে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি পর্যায়ের গান নিয়ে যথেষ্ট আদিখ্যেতা করা হয়ে গেছে। শুধু কী তাই ! বৃষ্টি পড়ল কি পড়ল না আমাদের ছোটো উঠোনের সিঁড়ির ধাপিতে বসে বসে চাঁপাফুলরঙা রোগা বইটি খুলবই আমি। যে বইয়ের নাম ‘ছিন্নপত্র’।
বড়ো হতে হতে নশ্বরতা যখন আমাকে আধমরা করে ফেলেছে প্রায় সেরকম একটা সময় ফের প্রবল বৃষ্টিপাত। বাঁধভাঙা শ্রাবণ। আমরা দুজনে আলকেউটের ভয় উপেক্ষা করে আলপথ ধরে হেঁটে হেঁটে একটা বাড়িতে গেলাম। তারপর সারারাত তুমুল বৃষ্টি। মুহূর্মুহূ বজ্রপাত।
তাই, বর্ষা আমি ভুলি না কখনও।
লিখি,
বাঁশবন আমাকে শুধু টেনে নিয়েছে তার ঘুমে
আর সেই ঘুমের পথ চিরে-চিরে তখনই তো দেখা হল
আমাদের দেখা হল
সে ছিল নির্জন প্রেতজন্ম তারপর শেয়ালজন্ম তারপর মানুষ
গাছতলার অন্ধকারের মতো আমি
তোমার বাঁশপাতারং কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালাম যেই
সেই থেকে বৃষ্টি
শুধু বৃষ্টি, কী ভীষণ বৃষ্টি, পুকুর-ডোবানো বৃষ্টি
আমরা জানলাম একটিই ঋতু ঘিরে থাকবে আমাদের রোজ-রোজ
একটিমাত্র রং হবে আকাশের মেঘের রং…
এরপর দিন যায় দিন যায়। দিনগত পাপক্ষয় চুকিয়ে এমন এক চোখ ফুটে উঠল আমার চেতনায়, সজল মেঘের ছায়া ঘনিয়ে ওঠার রোম্যান্টিকতা ছাপিয়ে যে শুধু অন্ধকার দেখতে পাবে। বর্ষার বানভাসি রাস্তায় কাগজের নৌকো না ভাসিয়ে সে দেখবে হুড়মুড় করে ড্রেনের জল ঢুকে পড়ছে ফুটপাতের অস্থায়ী সংসারে। খড়কুটোর মতো ভেসে যাচ্ছে হাঁড়িকড়া। ভেসে যাচ্ছে দৈনন্দিনতা।
কিন্তু এও তো ঠিক যে বৃষ্টি না হলে প্রকৃতি বাঁচবে কীকরে। গাছ কীভাবে ফুলের সুগন্ধ এনে দেবে। আর কৃষিকাজ? তার জন্যও তো বৃষ্টি চাই!
তবু জানেন, আজও গভীর বৃষ্টিপাতের সন্ধেবেলা আমি চোখ বুজলেই দেখতে পাই দুজন হতগরিব ভাইবোন প্রবল বৃষ্টির মধ্যে ছুটোছুটি করে নেচে বেড়াচ্ছে। বৃষ্টির আধিক্যে ওদের মুখ যুঁইফুলের মতো সাদা হয়ে উঠছে। আম. নারকেল যা পাচ্ছে কুড়িয়ে নিচ্ছে অপার উল্লাসে। ঘরে ফিরে, খুকিটি জ্বরে আচ্ছন্ন হয়ে পড়বে। আর উঠবে না।। বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালি’-র অপু-দুর্গা এরা। বইটা যতবার পড়ি ততবার নতুন করে টের পাই, আষাঢ়-শ্রাবণের বুকের ভিতর মৃত্যু লুকিয়ে আছে।
বৃষ্টি বেয়ে তখন কত কী। লোভীর চকচকে চোখ। অপমান। নিগ্রহ। তখন আবার লিখি,
যখন, খিচুড়ি -ইলিশভাজা ঘটানোর সামর্থ প্রচুর...
যখন, বাইরে ঝাপসা, আর, ভিতরে মস্তি একঘর...
যখন রবীন্দ্রসংগীত গাইছি, বৃষ্টিজল নামছে ব্যাপক...
যখন, রেনি-ডে নেব, অফিস লালচোখ দেখাবে না...
যখন, ছাতা উল্টোলেও শুধু আনন্দ ঢালছে আকাশ...
তখন মেঘ-ঘুটঘুটে পথে একলা হেঁটে যাচ্ছে এক লতাসম মেয়ে!
তখন সপসপে গলিতে একটা কুকুর অবধি ডেকে উঠল না!
তখন কয়েকজন ছেলে সজল লতাটিকে ওই, ভেঙেচুরে দিচ্ছে বারবার!
তখন নীচু দিয়ে যাওয়া আস্ত শ্রাবণমাস পাঁকগন্ধে ভরপুর হল!
জানালার কাচ টেনে আমরা বর্ষা পেলাম