
নজরুল প্রতিভার বিভিন্ন দিক নিয়ে দেশে বিদেশে বহু কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-পণ্ডিত-মনীষীরা আলোচনা করেছেন। নজরুল গবেষকরা নজরুলের জীবন ও কর্মকাণ্ডের নানা দিক নিয়ে এখনও অবিরাম গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। অসাধারণ মানুষের জীবনী লেখা হয় সাধারণ মানুষের শিক্ষার জন্য। সুখ-দুঃখের উৎস সন্ধানের প্রয়োজন হয় অনাগত মানুষের জন্য। শিল্প সাহিত্য সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যাঁরা বিশ্ববরেণ্য , তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন কাজী নজরুল ইসলাম ,আমার ঠাকুর্দা।
তিনি তাঁর ব্যক্তিজীবন বা কর্মজীবনের কোনো স্মৃতিচারণা করেননি বা লেখেননি কোনো আত্মজীবনী। সেসময়ও তিনি পাননি। মাত্র ৪২ বছর বয়সে তাঁর জীবনে নেমে এসেছিল স্তব্ধতা। আবার এমন কেউও ছিলেন না, যিনি প্রতিনিয়ত যাযাবর কবির সঙ্গে থেকে ,তাঁর জীবন ও কর্মের প্রতি লক্ষ্য রেখে ধারাবাহিক বিবরণ দিতে পারেন -যার ওপর নির্ভর করে কবির প্রকৃত তথ্যভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ জীবনী রচিত হয়ে অগণিত নজরুলপ্রেমী এবং গবেষকদের নজরুল চর্চার সহায়ক হতে পারে। তাই তাঁর কৈশোর যৌবন পারিবারিক জীবন ও জীবনসংগ্রামের অনেক তথ্য আজও অজানা ও রহস্যাবৃত।সুতরাং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন লোকের খণ্ডিত স্মৃতির আলোকে রচনা করতে হবে পূর্ণাঙ্গ ‘নজরুল-চরিত মানস’ …
ব্যক্তিজীবনের ঘটনার প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই প্রতিফলিত হয় কবি-সাহিত্যিকের কাব্যে, সাহিত্যে। নজরুলও তার ব্যতিক্রম নন… কোনো বিতর্কে না গিয়ে নজরুলের অস্থির জীবনে যে নারী স্থিতি এনেছিলেন ,তাঁকে গৃহী করেছিলেন, দিয়েছিলেন পিতৃত্বের আস্বাদ এখানে সেই নজরুল জায়া ‘আশালতা'র কথা জানানোর চেষ্টা করব ,যিনি সৌভাগ্যক্রমে আমার ঠাকুরমা বা দাদী। যাঁর কথা না জানলে নজরুলকে জানা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ভাগ্য বারবার কবি ও কবিপত্নীকে বঞ্চিত করেছে সুখ-সম্মৃদ্ধি থেকে। তবুও ‘আশালতা’ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজের অসমর্থ শরীর নিয়েও স্বামী সন্তান ও সংসার গভীর মমত্ববোধে আগলে রেখেছিলেন। তাঁর তুলনা করা চলে একমাত্র সর্বংসহা ধরিত্রীর সঙ্গে। তিনি প্রকৃত অর্থেই ছিলেন নজরুলের জীবনেও আশার লতা...
নজরুল প্রেমের কবি..ধুলোমাটির তুচ্ছ মানুষের প্রেমই তাঁর সম্পদ। তাঁর সমস্ত গান কবিতা রক্তমাংসের মানুষের ব্যথা বেদনা কামনায় ভরপুর। যে ব্যথা তিনি পাননি,সেই অপরূপ ব্যথার গান তিনি ইনিয়ে বিনিয়ে গাননি , এক কথায় তিনি ব্যথাবিলাসী ছিলেন না...
বাংলাদেশের প্রায় সবখানেই ছিল নজরুলের বাসভূমি। একজায়গায় বেশিদিন থাকা ছিল তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ। এইভাবে ঘুরতে ঘুরতে ঘটনাচক্রে তিনি উপস্থিত হন কুমিল্লায়। কুমিল্লার নানা ঘটনা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
বলা হয়,প্রত্যেক পুরুষের সাফল্যের আড়ালে কোনো না কোনো নারীর অবদান থাকে। আমার দাদু কাজী নজরুল ইসলামও সেকথা বিশ্বাস করতেন। তিনি তাঁর ‘নারী' কবিতায় বলেছেন,
‘কোনো কালে একা হয়নিকো জয়ী পুরুষের তরবারি
প্রেরণা দিয়েছে,শক্তি দিয়েছে বিজয়লক্ষ্মী নারী।’
যৌবনে পদার্পণের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিজীবনের সব ব্যাথা-বেদনা-হতাশা -বঞ্চনা ঝেড়ে ফেলে নজরুলের ছন্নছাড়া মন খুঁজে পেতে চেয়েছিল এক নারীর অনাবিল প্রেম প্রীতি ভালোবাসা। তাঁর সংসার বিমুখ মন সংসারের সাথে একটা আপোষ মীমাংসার পথ খুঁজছিল। তিনি কুমিল্লায় ষোড়শী সৈয়দা খাতুনের মধ্যে তাঁর সেই মানসীকে খুঁজে পেলেন। ভালোবেসে নজরুল তাঁর নাম রাখলেন ‘নার্গিস’…কিন্তু তার কাছ থেকে চরম আঘাত পেয়ে প্রেমবিদগ্ধ নজরুল তাঁর মনের দৌলত হারিয়ে বিয়ের রাতেই দৌলতপুর ছেড়েছিলেন। শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে তিনি কান্দিপাড়ে সেনগুপ্ত পরিবারে এসে পড়েন। এই পরিবারের বীরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের পূর্বপরিচিত ছিলেন নজরুল এবং এই পরিবারের সব সদস্যদেরই প্রিয়পাত্র ছিলেন তিনি । তাই তাঁর এই অবস্থায় সকলেই তাঁকে সুস্থ করে তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
প্রেম খোঁজে নিরাপদ আশ্রয়। সেই আশ্রয় নজরুল খুঁজে পেলেন বসন্তকুমার সেনগুপ্ত ও গিরিবালা দেবীর একমাত্র কিশোরী কন্যা ‘আশালতা’-র মধ্যে। জন্ম মানিকগঞ্জের তেওতা গ্রামে হলেও বাবার মৃত্যুর পর কাকা ইন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত এবং কাকিমা বিরজাসুন্দরী দেবীর আশ্রয়ে কান্দিপাড়ে থাকতে এসেছিলেন আশালতা। চাঁপাফুলের মতো গায়ের রং ,তাঁর অপর নাম ‘দোলন’, ডাক নাম ‘দুলি’…নজরুল ভালোবেসে নাম রাখলেন‘প্রমীলা’…প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে , জেলে থাকাকালীন নজরুলের কাব্যগ্রন্থ ‘দোলন-চাঁপা’র নামকরণ দুলির চাঁপা বর্ণের কথা মনে রেখেই। পড়াশুনা,গানবাজনায় চৌকস ছিলেন দুলি। অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেবার জন্য ফয়জুন্নিসা (গভর্নমেন্ট )গার্লস হাই স্কুল ছাড়তে হয় তাঁকে। তিনি কবিও ছিলেন। তাঁর লেখা দুটি কবিতা ‘শঙ্কিতা’ ও ’করুণা’ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়...১৯২১ সাল থেকে ১৯২২ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় বার চারেক নজরুল কান্দিপাড়ে সেনগুপ্ত পরিবারে গিয়েছিলেন ও বেশ কয়েক মাস সেখানে থাকেন । এই সময় প্রমীলার সান্নিধ্য নজরুলের মনে নতুন আবেগ সঞ্চার করে...দুজনের মধ্যে গড়ে উঠেছিল গভীর হৃদ্যতা ,যা ধীরে ধীরে ভালোবাসায় রূপান্তরিত হয়। এইভালোবাসার কথা জানাজানি হলে এই সম্পর্ক ঘিরে সেই সময়কার রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থায় তীব্র উত্তেজনা ও জটিলতার সৃষ্টি হয়…তখন গিরিবালা দেবী কান্দিপাড় ছেড়ে মেয়েকে নিয়ে তাঁর বাপের বাড়ি সমস্তিপুরে চলে যান। ১৯২৪ সালের এপ্রিল মাসে নজরুল ,মা-মেয়েকে সমস্তিপুর থেকে কলকাতায় নিয়ে আসেন। অবশেষে আশালতা তথা নজরুলের প্রমীলার একমাত্র অভিভাবিকা গিরিবালা দেবীর সম্মতিতে ১৬ বছরের প্রমীলার সঙ্গে ২২ বছরের নজরুলের বিয়ে স্থির হয়…
কুমিল্লায় তিনি লেখেন তাঁর ‘বিজয়িনী প্রমীলা’কে :
‘হে মোর রাণী ,তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে
আমার বিজয়কেতন লুটায় তোমার চরণতলে এসে’ …
নজরুল নিজের জীবনে ধর্ম বা সমাজের অনুশাসন মানতেন না। প্রমীলাকে ধর্মান্তরিত করে অর্থাৎ ইসলামধর্মে দীক্ষিত করে বিয়ে করার কথা নজরুল চিন্তাই করতে পারতেন না...অবশেষে স্থির হয় ’আহলেকিতাব’ মতে নিজের নিজের ধর্ম বজায় রেখে মুসলমানী মতে বিয়ে হওয়া যেহেতু অসিদ্ধ নয় সুতরাং এই নিয়মেই নজরুল ও প্রমীলাবিবাহসূত্রে আবদ্ধ হবেন। হলেনও তাই।
প্রমীলা সম্পর্কে কবি নজরুলের কিছু ঘনিষ্ঠ মানুষের কাছ থেকে জানা যায় তিনি কেমন ছিলেন।
কবি জসীমউদ্দীন তাঁর স্মৃতিচারণায় জানান , ‘একবার কলিকাতা গিয়া দেখা করিতে তাঁর বাসায় যাই…কবি আমার সঙ্গে ভাবীর পরিচয় করাইয়া দিলেন। ভাবীর সেই রাঙাটুকটুকে মুখের হাসিটি আজও মনে আছে… ভাবীর মত এমন সর্বংসহা মেয়ে বাংলাদেশে খুব কমই পাওয়া যায়। কবির ছন্নছাড়া নোঙরহীনজীবন। এই জীবনের অন্তঃপুরে স্নেহময় মমতায় মধুর হইয়া চিরকাল তিনি কবির কাব্য সাধনাকে জয়যুক্ত করিয়াছিলেন। কোনো সময় তাঁহাকে কবির সম্পর্কে কোনো অভিযোগ করতে দেখি নাই।’
খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দিন প্রমীলা সম্বন্ধে লিখেছেন, ‘নজরুলের স্ত্রীটি হচ্ছে শান্ত স্বভাব আর ভদ্র। আজকালকার মেয়েদের সঙ্গে তাঁর তুলনা হয় না। নিজে তিনি শিক্ষিতা ,বিদুষী,কিন্তু যে কোনো সহজ অনাড়ম্বর জীবনের অধিকারিণী। গ্রাম্য মেয়েদের মধ্যে ফেলে দিলে তিনি নির্বিবাদে তাদের সঙ্গে খাপ খাইয়েনিতে পারেন। মাসিমা(গিরিবালা দেবী)র সাহায্য না পেলে এর পক্ষে নজরুলের জীবনকে সুনিয়ন্ত্রিত করা হয়তো কঠিন হত।’
কাজী নজরুল ইসলামের স্নেহাস্পদ বন্ধু ছিলেন শান্তিপদ সিংহ । কবি ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে ২০ বছরেরও বেশিসময় কেটেছে তাঁর । তিনি খুব কাছ থেকে প্রমীলাকে দেখেছিলেন। তিনি তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখছেন , ‘কবির কাজের ব্যাপারে যেমন তাঁর স্ত্রী মনোযোগী ছিলেন,কবির লেখার ব্যাপারেও অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ছিল তাঁর।কবির প্রায় সব গানের সুর তার কণ্ঠস্থ ছিল…অত্যন্ত চুপচাপ ও ভালোমানুষ ছিলেন বলে কেউ তা জানতেন না...স্বয়ং কবি নিজে ছাড়া আর কিছুটা জানতাম আমি….এমনও হয়েছে,কবি আগের দিন রাত্রে একটা গান লিখে তাতে সুর দিয়ে দুই-একবার গেয়েছেন,তারপর দিন সকালে গানের বাণী বা সুর কিংবা দুইই একটু আধটুবদল করেছেন ,কবিপত্নী ঠিক তা ধরে ফেলে কবিকে বলতেন। কবি একটু হাসতেন। একবার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু দুজন লোককে কবির বাড়ি পাঠালেন তাঁর প্রিয় গান ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’র বাণী সংগ্রহ করে সুরটাও জেনে আসার জন্য। কবি সেই সময় বাড়ি না থাকায় কবিপত্নী প্রমীলাদেবী গানটি শিখিয়ে দিয়েছিলেন।
সারাদিনের কাজের শেষে বাড়ি ফিরে এসে গৃহী নজরুল ব্রীজ ,ব্রে খেলতে বসতেন। এই খেলায় প্রমীলাও যোগদিতেন। তাঁকে ব্রে করার জন্য কবি উঠেপড়ে লাগতেন। যদি প্রমীলা ব্রে হতেন কবি আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেতেন।’ প্রাণাধিক প্রিয় পুত্র চার বছরের বুলবুলের অকালমৃত্যু স্বামী-স্ত্রী দুজনের জীবনেই চরম আঘাত হেনেছিল। কিন্তু প্রমীলা নিজের দুঃখ ভুলে এই সময় কবিকে সুস্থ রাখতে সবসময় চেষ্টা করতেন। এরপর কবিপরিবারে নেমে এল চরম দুর্দিন। প্রথমে প্রমীলা তারপর নজরুল ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অর্থ সংকট তো ছিলই , তার ওপর গিরিবালা দেবী,যিনি অসুস্থ মেয়ে-জামাই ও তাঁদের ছেলেদের সামলেছেন ,কবির অসুস্থতার চার-পাঁচ বছর পর তিনিও নিরুদ্দিষ্টা হলেন। তখন অশক্ত শরীর নিয়ে সংসারের সব দায়িত্ব সামলেছেন প্রমীলা। রাঁচিতে কবিকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হলে কবির সঙ্গে কবিপত্নীও গিয়েছিলেন। আমার বাবা ,কবির কনিষ্ঠ পুত্র কাজী অনিরুদ্ধ, তাঁর বাবা মায়ের প্রতি অত্যন্ত দায়িত্বশীল ছিলেন এবং ছোটোছেলের প্রতি মাও খুব নির্ভরশীল ছিলেন। আমার বাবাকে লেখা ঠাকুমার এই চিঠি থেকে মনের কিছু ভাবনার কথা জানা যায় ,যা চাপাস্বভাবের কবিপত্নীকে নতুন করে চিনতে সাহায্য
করে…
কল্যাণীয়েষু নিনি ,
…..নিজের মতে এ পর্যন্ত কিছুই করতে পারিনি, আর যে করতে পারবো সে ভরসাও নাই...এ জীবনে মনস্তাপভোগ করা ছাড়া আর গতি নাই...আমি কাছে থেকেও সংসারের সুব্যবস্থা করতে পারিনি কোনও দিন। সেজন্য আমার কাছে থাকা বা না থাকা সবই সমান। কিন্তু এই বলেই তো মনকে প্রবোধ দিতে পারি না। তোমাদের জন্য আমার কাতরতার সীমা নেই...আমি ছাড়া তোমাদের কেউ নাই…আর তোমরা ছাড়া আমার কে আছে পৃথিবীতে ? তোমরা যাঁর ঘরে এসেছিলে,তাঁর স্নেহের কি তুলনা ছিল ? তিনি একাই তোমাদের সবদিক দিয়ে ভরিয়ে রাখতেন। কিন্তু কোন অভিশাপে তা হল না...তোমরা কিছুই পেলে না….এখন ভাবনা চিন্তা সব আমার একার। এজন্য অনুযোগ আসে না। এ দুঃখ শুধু অনুভব করার। আমি কখনো নিজের দুঃখ দুর্বলতা প্রকাশ করতে ভালোবাসি না। এখন বড় হয়েছ ,সবই বুঝতে পারো।’ …
(নিনি,অনিরুদ্ধের ডাক নাম )
আর একটি চিঠিতে আমার বাবা কাজী অনিরুদ্ধকে ঠাকুমা প্রমীলা দেবী লিখছেন :
‘…সংসারের অব্যবস্থায় আমি মরণাধিক যন্ত্রণা পাচ্ছি। সংসারে টাকা ও স্ত্রীলোকের অভাবে এই দশা ঘটে…বর্তমানে টাকার এমন অভাব ঘটেনি যাতে এত কষ্ট সইতে হচ্ছে। বাবা,আমার চোখের জলে অমঙ্গল হবে না। এই চোখের জলের সঙ্গে প্রতিনিয়ত প্রার্থনা করছি ,তোমার সকল অশান্তি, সব বিঘ্ন দূর হোক...বাবা,হতাশ হয়ো না ,কায়মনে ওঁকে স্মরণ করো ,যাঁর কৃপায় অলৌকিক ঘটনা ঘটে...আমাদের ব্যাধির জন্য কষ্ট কোরো না...অনেকদিন গত হয়েছে,এতে প্রাণভয় নেই …তুমি ছাড়া শান্তি পাবার আর কিছুই নাই জীবনে। তোমাকে ভালো দেখতে না পেলে এই মৃত্যুহীন প্রাণ অসহায় হয়ে ওঠে…আমারই জন্য এবং যাঁর ছেলে তুমি ,তাঁর প্রতি কর্তব্যবোধে মনকে সবল রাখো। ওঁর অসুখের প্রথম অবস্থায় তোমার জন্য শুধু ব্যাকুল হতেন এবং তোমার নাম
করতেন।…’
এই সময়ই আমার বাবার সঙ্গে মায়ের পরিচয় হয় রাঁচিতে ,পরবর্তীতে আমার মা কল্যাণী কাজী এই পরিবারে প্রথম পুত্রবধূ হয়ে আসেন । তিনি ছিলেন নজরুল-প্রমীলার কনিষ্ঠ পুত্রবধূ,যিনি ৬৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই পরিবারে থেকে প্রমীলা দেবীর সান্নিধ্য পেয়েছেন।
বুকভরা কৌতূহল নিয়ে মা কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তুমি এসে দাদু,মনি (ঠাকুমা )কে কেমন দেখেছ ? কীভাবে পেয়েছ ? (ঠাকুমাকে মা ,দাদারা ‘মামণি’বা‘মণি’বলে ডাকতেন। )
মা বললেন, ‘..উত্থানশক্তিহীনা মায়ের কর্মক্ষমতা দিনে দিনে আমাকে বিস্মিত করেছিল। সংসারের প্রয়োজনীয় কাজের সবটুকুই মা নিজে হাতে করতে ভালোবাসতেন। প্রত্যক্ষদর্শী ছাড়া কেউ সে দৃশ্য কল্পনা করতে পারবে না যে কী করে তা সম্ভব ?! তাঁর নিম্নাঙ্গ অবশ হয়ে গেলেও উর্ধাঙ্গ সক্ষম ছিল। তাঁর নির্দেশে দরজার সাথে সমান্তরালভাবে রাখা একটি নীচু চৌকির একধারে তিনি শুয়ে থাকতেন। কোনো কিছু যাতে তাঁর নজর এড়িয়ে না যায় তাই এমনভাবে রাখা হয়েছিল। আমাদের সারাদিনের ক্লান্তি অপনোদনের জায়গা ছিল মায়ের পাশের এই জায়গাটুকু। এই চৌকির ওপর পাশ ফিরে শুয়ে তিনি মাছ তরকারি কুটতেন। কোনো কোনো সময় স্টোভে চা বা অন্যান্য রান্নাও করতেন। তাঁকে নাতিনাতনীদের জন্য সোয়েটার বুনতে বা ছেলেদের জামায় বোতাম লাগাতেও দেখেছি। যতদিন বেঁচেছিলেন বেশির ভাগ দিন তিনি নিজে হাতে বাবাকে খাইয়ে দিতেন। খাওয়া শেষ হলে তাঁর হাত মুখ ধুইয়ে সযত্নে তোয়ালে দিয়ে মুছিয়ে দিতেন। মা খাবার পরিবেশন না করলে বা তাঁর সামনে বসে না খেলে আমাদেরও তৃপ্তি হত না ,আর তিনি নিজেও তৃপ্ত হতেন না। লোক খাওয়ানোর ব্যাপারে তাঁর সাথে একমাত্র অন্নপূর্ণারই তুলনা চলে…যে কোনো সময়,যে কোনো অবস্থায় ,যে লোকই এসেছেন -মা কখনো তাঁদের না খাইয়ে ছাড়েননি।
টাকাকড়ির হিসাবনিকাশ সবই তিনি রাখতেন।কখনো কখনো আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হয়েছে, আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছে,তবুও কখনো তাঁকে ভয় পেতে বা ভেঙে পড়তে দেখিনি।ধীর-স্থিরভাবে কীভাবে যে সেই সমস্যার সমাধান করেছেন তা ভাবলে আজ অবাক লাগে! বাবা সারারাত গোটা বাড়ি পায়চারি করতেন। আমরা সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও মা বাবাকে দৃষ্টির আড়াল করতেন না…লুডো,চাইনিস চেকার,তাস খেলতেন আর বাবাকে পাহারা দিতেন। বেশিক্ষণ সাড়াশব্দ না পেলে হাঁক দিতেন, ‘কই ,কোথায় গেলে? এদিকে এসো। .’ ভোরবেলা আমরা জাগলে মা ঘুমাতেন। মা-বাবা আমাদের কাছে উত্তর কলকাতার টালা পার্কে থাকতেন। কখনো তাঁরা একে অন্যকে ছেড়ে থাকেননি। মায়ের মৃত্যুর পর আমাদের বাড়ি থেকে যখন বাবাকে তাঁদের বাড়িতে, ক্রিস্টোফার রোডে নিয়ে যেতে আমার ভাসুর কাজী সব্যসাচী এলেন,সেদিন বাবাকে কিছুতেই ঘর থেকে বের করা যাচ্ছিল না…সে এক করুণ দৃশ্য।…বাবা ফিরে ফিরে শুধু সেই ফাঁকা চৌকির দিকে শূন্য দৃষ্টিতে খুঁজছেন তাঁর চিরসাথী প্রমীলাকে ,যাঁকে ছাড়া কখনো তিনি কোথাও যা্ননি।..অবশেষে আমার স্বামী অনিরুদ্ধ বাবাকে গাড়ি চড়ে ঘোরাতে নিয়ে যাবে বলে ঘর থেকে বার করে নিয়ে গিয়েছিল…সেদিন আমাদের চোখের জল বাধ মানেনি। সেদিন বাবার মতো আমরাও অভিভাবকহীন হলাম। আমাদের মামণি তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ,মধুর ব্যবহার ,ব্যক্তিত্ব ও দায়িত্ববোধে ছিলেন সকলের প্রিয় ও অনন্যা।
বাবাকে তিনি এতটাই শ্রদ্ধা করতেন ,ভালোবাসতেন তিনি সবসময় স্বাক্ষর করতেন ‘প্রমীলা নজরুল ইসলাম’ ….
বুদ্ধদেব বন্দ্যোপাধ্যায় ‘প্রমীলা - নজরুল’ গ্রন্থে লিখেছেন ‘আমরা যদি পৃথিবী ব্যাপী কবি সাহিত্যিকদের জীবনীপঞ্জি খুঁজে দেখি, সংগত ভাবেই দেখতে পাব, পারস্পারিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার মেলবন্ধনে সৃজনীশক্তির অসামান্য বিকাশ ঘটেছে দেশে, দেশান্তরে। যে প্রতিভাটি বিকশিত হল তার আড়ালে নিয়ামকশক্তি হিসাবে রয়ে গেল আরো একটি প্রতিভা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আড়ালের এই শক্তিটি লোকচক্ষুর অগোচরে থেকে যায়। মানুষ তার খোঁজ পায় না কখনো। বহুক্ষেত্রে খোঁজ রাখতেও চায় না। ফলে সংশ্লিষ্ট ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
বিদ্রোহী কবি , জনমানসের কবি, ভারতীয় ভাবধারার অন্যতম প্রধান কবি-সারথী কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্য পর্যালোচনা করলে আমরা উপরোক্ত সত্য-বীক্ষণে স্থিত হতে পারি। তাঁর ঝঞ্ঝাবহুল ও তীব্রগতিময় জীবনে বড়ো একটি অংশে দক্ষ কাণ্ডারীর মতো হাল ধরেছিলেন তাঁর সহধর্মিনী প্রমীলা নজরুল ইসলাম।”
(লেখক কবির কনিষ্ঠ পৌত্রী)