তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
মান্না দে-কে নিয়ে দু’ চারটে কথা


উত্তম মান্না
বাংলা ফিল্মের গানের বিগ বস অবশ্যই হেনস্ত। ব্যাপারটা এতদুর সত্য যে সিনে এক্সপার্টরা মনে করেন মহানায়ক উত্তমকুমার নির্মাণের পেছনেও হেমন্তের অনেকটাই অবদান আছে। কিন্তু সে কোন উত্তম ? 'অগ্নিপরীক্ষা' থেকে বাংলা সিনেমার যে এক নতুন রোমান্টিক আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল তার নায়ক উত্তম। ঠিক মতো হিসেব করলে এই উত্তম-সুচিত্রা নামক হরগৌরীর মেয়াদ তো ঠিক ছ'বছর। মানছি, এই ছ'বছরে তৈরি প্রেমের রসায়নের আবেদন সুদূর প্রসারিত। হয়তো আজও রয়েছে। কিন্তু ষাটের দশকের শুরু থেকেই উত্তমকুমার অন্য এক মুক্ত পথ খুঁজেছেন। সেখানে সুচিত্রা নামক প্রে্মসঙ্গী নেই তাঁর। সোনার জুটি ভেঙে বাংলা ছবির অন্য নায়িকাদের সঙ্গে এক অন্যতর পথ খুঁজছেন। আর তখনই প্রায় হেমন্ত-প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েই উত্তম কন্ঠের নেপথ্যেও এসেছিলেন মান্না দে। উত্তম-সুচিত্রার ছবির গানে যে প্রেমের ব্যাকরণ তৈরি হয়েছিল তা থেকে একশো আশি ডিগ্রি প্রেমের গল্পকে ঘুরিয়ে দিলেন মান্না। হেমন্তের মতোই তৈরি হল উত্তম-মান্নার এক যুগ। মান্নার সঙ্গে যখন জুটি বাঁধছেন প্রথম তখন তাঁর পাশে বাংলা সিনেমার রাজকন্যা আর নেই। পাশে রয়েছেন এমন এক নায়িকা, যাঁর সৌন্দর্যের গ্ল্যামারের চেয়ে মননের ছটা বেশি। গঙ্গায় নৌকা যাপনে যখন নিবিড় প্রেমের গল্প বাঁধছেন বাংলা সিনেমার প্রথম স্টার উত্তমকুমার, তখন তাঁর সেই প্রেমের সমীকরণে প্রধান অনুঘটক মান্না দে-র কণ্ঠে ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’।

মুড় মুড়কে না দেখ
উত্তর কলকাতার সিমলা অঞ্চলে মান্না দে-র আদিবাড়ি। পাশেই বাংলা সিনেমার কিংবদন্তি অভিনেত্রী প্রয়াত ছায়া দেবীর বাড়ি। ফলে বাংলা সিনেমার অনেক রহস্যকেই ছোটোবেলা থেকে দেখেছেন মান্না দে। কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে তো আর এক প্রবাদপ্রতিম। কলেজ জীবনে মান্না দে-র আইডল প্রমথেশ বড়ুয়া। তিনিই তখন শাসন করছেন টালিগঞ্জ। আর গানে মুম্বাইতে শচীন কর্তা। আর এই সময়ই মান্না গানের জগতে আসছেন। তবে এই অভিমান তাঁর থাকতেই পারে যে বাংলাদেশ থেকে কেউ তাঁকে বোঝবার চেষ্টা করেননি। সত্যিই তো প্রথম সিনেমার গান তিনি গাইছেন হিন্দিতেই। কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে-র সংগীত পরিচালনায় ‘তমন্না’ ছবিতে সুরাইয়ার সঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠে। আর প্রায় একক কণ্ঠে প্লে-ব্যাক শঙ্কর রবির সংগীত পরিচালনায় ‘রাম রাজ্য' ছবিতে। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৩। গানের তালিম নিচ্ছেন আমন আলি খানের কাছে। পরবর্তীকালে অবশ্য তালিমগুরু হিসেবে পেয়েছেন আবদুর রহমান খান, দবীর খান এবং গুলাম মুস্তাফা খানকে। মুম্বাইতে তিনি প্রথম থেকেই ঠিক করেছিলেন, 'আই হ্যাভ টু ডান মাই বেস্ট । আই নো, ইট ইজ মাই ব্রেড অ্যান্ড বাটার। আমি এখানে কোনো কম্প্রোমাইজ করিনি। আমাকে সেরাটা দিতেই হবে।' আর এর জন্য দীর্ঘ সময় সহকারি সংগীত পরিচালক হিসেবে থেকে গায়ক হয়ে ওঠার জন্য কঠোর এক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই গেছেন তিনি। তাঁর ছেলেবেলা কেটেছে গানের বাড়িতেই। কৃষ্ণচন্দ্র দে-র বাড়ি মানে তো গানের বাড়ি। দীর্ঘ সাতবছর সহকারী সংগীত পরিচালক হিসেবে কাটিয়ে আবার তিনি ফিরে আসছেন প্লে ব্যাকের পথে। শচীন দেব বর্মনের সংগীত পরিচালনায় 'মশাল' ছবিতে ‘উপর গগন বিশাল' গানটিই তাঁর সামনে খুলে দিল সাফল্যের দরজা। সময়টা ১৯৫০। আর এক বছরের মধ্যেই তো হিন্দি ছবি 'আওয়ারা'তে প্লেব্যাক। খোদ ‘আওয়ারা’ রাজকাপুরের বন্ধুত্বপূর্ণ অনুরোধেই ‘তেরে বিন আগ ইয়ে চাঁদনি'। আর সেই বন্ধুত্বের সম্পর্ক থেকেওছে দীর্ঘ সময় ধরে । 'শ্রী ৪২০'-তে তো তিনটে গান মান্না দে-র।

অনুপ্রেরণা মা ও কেরল কন্যা
উত্তর কলকাতার সিমলা পাড়ার যুবক বাংলার প্রেম ও নিয়ে প্রবাসী হয়েছিলেন, শুধু একটা স্বপ্ন চোখে নিয়ে : গায়ক হবেন। এবং সে স্বপ্ন সার্থকও করেছিলেন মান্না দে। রফি, কিশোর, তালাত, মুকেশের একাধিপত্যের মধ্যে যখনই সামান্যতম সুযোগ পেয়েছেন চমকে দিয়েছেন সকলকে। চমকে দেওয়াই কথা। ধ্রুপদী সংগীতের পাশাপাশি দেশি সংগীত এবং কীর্তন এই তালিমের মধ্যে দিয়েই তো মান্না দে তৈরি করেছেন তাঁর নিজস্ব গায়নশৈলি। তাই মুম্বইয়ের সংগীত পরিচালকেরা যখন রাগাশ্রয়ী গান ব্যবহার করার কথা ভেবেছেন ছবিতে, মান্না দে-কে ডাকতে প্রায় বলা যায় বাধ্য হয়েছেন। আর এই প্রসঙ্গে তো প্রায় সব সংগীত পরিচালকই রয়েছেন --- শঙ্কর জয়কিষেণ, শচীন দেব বর্মন, সলিল চৌধুরী, রাহুল দেব বর্মন, রবি, কে নন। হিন্দি সিনেমায় নিজেকে ব্যতিক্রমী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে দেন তো মান্না বেশ কিছু রাগাশ্রয়ী গানের মধ্যে দিয়েই। যেমন 'লাগা চুনরি মে দাগ', 'ঝনক ঝনক তোরে বাজে', 'তেরে নয়না গোরি তেরে' এই রকম অনেক গানের কথাই তো বলা যেতে পারে। এসব গানে মান্না দে ছাড়া যেন আর অন্য বিকল্প নেই। তবে শুধু রাগাশ্রয়ী বা কেন? কাওয়ালির খেলাতেই বা তিনি কম কীসে ! 'অ্যায় মেরি জহরাজদি' আর ওয়েস্টার্ন টিউনে রাজ কাপুরের লিপে 'এ ভাই জরা দেখকে চলো' অথবা মেহমুদের জন্য 'আও টুইস্ট করো' তার সামান্য কিছু নমুনা মাত্র। আর লোকসুরে 'না চাহু সোনা চাঁদি' তো এখনও সংগীতপ্রেমীদের প্রাণের গান। একজন গায়ক অথচ এত বৈচিত্র্য : এটাই তো মান্না দে। যাঁকে নিয়ে কিশোরকুমারও তাঁদের পারিবারিক ছবি 'চলতি কা নাম গাড়ি'-তে গান গাওয়ান। হিন্দি ফিল্‌মে মান্না দে'র এইরকম ১৫০টা স্মরণীয় গান যে কোনো গান-রসিক মানুষ গড় গড় করে বলে দেবে। মান্না দে যে সবরকমের গান গাইতে পারেন এটা প্রমাণ করার জন্য দীর্ঘদিন তাঁকে সুযোগের অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। কেন-না, ওই সব জায়েন্ট গায়কদের চক্রব্যূহ ভেঙে ঢোকা সহজ ছিল না। মান্না দে-র প্লেব্যাকের রেকর্ডে তো প্রথমেই নাম থাকত না। প্রথম যে রেকর্ডে নাম এল সেখানে মান্না দে নয়, লেখা হল মুনা দে। তাঁর ভাষায় 'কত ভালো ভালো গান আছে নামই জানে না কেউ। রেকর্ডেও নাম নেই।' দীর্ঘ সত্তর বছর হিন্দি সিনেমায় প্লে ব্যাক করেছেন তিনি। শুধু হিন্দি সিনেমায় কেন, অসংখ্য ভারতীয় ভাষার সিনেমাতে গান গেয়েছেন – তেলুগু, মালয়ালম, মারাঠি, ওড়িয়া, অসমিয়া, তুডু, পাঞ্জাবি আর বাংলা তো আছেই।

মানা-মণ্ডা-মান্না
নামটাও মুম্বই-সম্পদ। প্রবোধচন্দ্র দে-কে মান্না দে করে তোলার দায়দায়িত্ব এই শহরেরই। মা ডাকতেন ‘মানা’ বলে। কাকাও ওই নামেই ডাকতেন। মুম্বই গিয়ে সেটাই হল মন্না, পরে মান্না । এমকী জীবনের প্রথম রেকর্ডে নাম ছাপা হয়েছিল মন্ডা দে। যাই হোক, সেই মান্নাই শত প্রতিকূলতায় বিভিন্ন সময়ে ঝলসে উঠে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রে তথা সঙ্গীতে।


Scroll to Top