তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
ঢাকার রাজপথে রঙিন জনস্রোত


বৈশাখের রোদ তখনও মিঠে। ভোর ছটা বাজতে না বাজতেই বেরিয়ে পড়েছি ঢাকার রাজপথে। তখনই রঙিন জনস্রোত দেখে মনে হচ্ছে, এরা কি তবে সারারাত পথেই ছিল? যানবাহন আজ নিয়ন্ত্রিত, অনেক দূর থেকে হাঁটতে হবে সবাইকেই। এত ভোরে এমন সাজগোজ করে এই বিপুল জনতা দূর দূরান্ত থেকে রমনায় পৌঁছল কীভাবে? চারুকলার ছেলেমেয়েরা নাহয় রাত জেগে সাজায় মঙ্গল শোভাযাত্রা, কিন্তু এই যে আট থেকে আশি লাল সাদা পাঞ্জাবি পায়জামা আর শাড়িতে সেজে, খোঁপায় ফুল গুঁজে হেঁটে চলেছে পহেলা বৈশাখ (বাংলাদেশে পয়লা নয়, পহেলা) উদযাপনে, এমনটা তো কলকাতায় হয় না। এপারের বাঙালির বর্ষবরণ মূলত পারিবারিক, বা বলা যায় আত্মীয়- বন্ধুকেন্দ্রিক। আর দোকানের হালখাতায় মিষ্টিমুখ। কিছু বছর ধরে অবশ্য ভাষা চেতনা সমিতির উদ্যোগে কলকাতায় অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এর সামনে বর্ষবরণ উৎসব হয়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান তো বটেই, পান্তাভাত আর শুঁটকি মাছ খাওয়ারও ব্যবস্থা থাকে। তবে কলকাতায় পয়লা বৈশাখে সেই সমারোহ কখনোই হয় না যা ঢাকার ধারে পাশে। ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে এই যে অসাম্প্রদায়িক উৎসব, সর্বজনীন উদযাপন, তা একান্তই ওপারের রীতি। বিশ্বব্যাপী বাঙালির দুর্ভাগ্য, যাঁর হাত ধরে, বা বলা ভা যাঁর কন্ঠে ভর করে রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখের সূচনা, সেই সনজিদা খাতুন চলে গেলেন বাংলা নতুন বছর ১৪৩২ আসার ঠিক আগেই। ১৯৬১ সালে পাকিস্তানি শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তাঁর সংগঠন ‘ছায়ানট’ রমনায় 'এসো হে বৈশাখ' গেয়ে যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল, তাকে মুছে ফেলতে পারেনি কেউ। বছরের পর বছর সেই সুরে সুর মিলিয়েছে লক্ষ মানুষ। আর সেই টানে ঢাকা তো বটেই, বাইরে থেকেও কত লোক রমনায় আসেন এই দিনটাতে।

ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রোদ। তবু আজ কিন্তু মানুষ পরোয়া করছে না। এ যেন পুজোর কলকাতা, রোদ-ঝড়- জল কোনো কিছুই দমাতে পারে না সম্মিলিত উচ্ছ্বাসের জোয়ার। কোথাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সরবতের স্টল দিয়েছে। গলা ভিজিয়ে নিন দইয়ের ঘোলে। কোথাও এক কিশোরীর হাতে বেলফুলের একগোছা মালা। আপনি -আমি কিনলে তবে ওর একলা বৈশাখ হয়ে উঠবে পহেলা। দূরে দেখা যাচ্ছে এগিয়ে আসছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। বিশাল বিশাল কাট আউট নিয়ে এগোচ্ছেন ছাত্রছাত্রী আর অধ্যাপকের দল। পেঁচা, হাতপাখা, বাঘ, মুখোশ, রণপা --- রাজপথ ঝলমলিয়ে উঠেছে। সেই সঙ্গে সমানতালে চলেছে বর্ষবরণের গান, নাচ, আবৃত্তি। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে দিয়েছে বিশ্ব সংস্কৃতির মর্যাদা। এদিকে বাচ্চা থেকে বুড়ো, পথের পাশে গাল পেতে বসে পড়ছে। কলেজের ছাত্রছাত্রীরা তুলি দিয়ে এঁকে দিচ্ছে নববর্ষের বার্তা। ছোট্ট এক কন্যাকে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'বল তো এটা বাংলা কোন সাল?' তার চটপটে জবাবে থমকে গেলাম, বাঙালি হয়েও আমি কি পারব হঠাৎ এমন প্রশ্নের মুখে হোঁচট না খেয়ে? ময়দানে এন্তার বিক্রি হচ্ছে মাটির থালায় পান্তা ভাত, ইলিশ মাছ ভাজা। লোভ সামলালাম। আমার জন্য ধানমন্ডিতে আত্মীয়বাড়িতে অপেক্ষা করছে আঠেরো রকমের ভর্তা আর পাঁচ রকমের মাছ। আলু থেকে চিংড়ি, শুঁটকি থেকে ইলিশের লেজ, কতরকম যে ভর্তা রাঁধে বাংলাদেশের বাঙালিরা! সে গল্প আরেকদিন।

এখন এটুকুই প্রার্থনা, হানাহানির এই মরুভৃমিতে মরুদ্যান হয়ে বেঁচে থাকুক পহেলা বৈশাখ। বাংলাদেশের এক কবিই লিখেছেন –
নববর্ষ তুই অনেক আকাঙ্ক্ষিত
বাঙালি জাতির মনে।
আসলি যদি রাঙিয়ে দিতে
ফিরিয়ে দে সেই হাসি উল্লাস;
স্তব্ধ হাহাকারের শূন্য ক্ষণে।


Scroll to Top