তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
এবারের বিধানসভা নির্বাচনে এসআই আর কি নির্ণায়ক ভূমিকা নিয়েছে ?

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফল বেরোনোর পর থেকেই একটি প্রশ্ন সকলের মনে বারবার ঘুরছে। বিজেপি কি SIR-কে নিজের মতো করে ব্যবহার করে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে তার ঐতিহাসিক সাফল্য পেল? এই প্রশ্নটি বা কৌতুহলকে অস্বীকার করা যায় না। এক কথায় বলা যায় এই নির্বাচনে SIR বিজেপিকে নিশ্চয়ই সাহায্য করেছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন বিজেপি শুধু SIR-এর কারণে জেতেনি। অনেকে মনে করেন এই বিধান সভা নির্বাচনে বাংলার মানুষ তৃণমূলের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে ।

এটাই এই ভোটের সবচেয়ে কঠিন সত্য।

তৃণমূল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল। মানুষও এক সময় সেই ক্ষমতার পাশে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতা যত পুরনো হয়েছে, তত তার গায়ে দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, দাদাগিরি এবং অহংকারের দাগ জমেছে। সাধারণ মানুষ কাজ চেয়েছে। সম্মান চেয়েছে। ন্যায্য পরিষেবা চেয়েছে। কিন্তু বহু জায়গায় তারা পেয়েছে দলীয় দাপট, কাটমানির সংস্কৃতি, চাকরি-দুর্নীতির লজ্জা, প্রশাসনের ওপর অবিশ্বাস এবং নেতাদের চরম ঔদ্ধত্য। এমনকি সাধারণ মানুষের কন্ঠ রোধ করা হয়েছে গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে টিএমসি

তাই এই ভোটে বিজেপির সাফল্যকে শুধু “Yes BJP” বলে ভাবলে ভুল হবে। এই ভোট অনেক বেশি “No TMC” ভোট। মানুষ বিজেপিকে ভালোবেসে যত না ভোট দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি তৃণমূলকে সরাতে ভোট দিয়েছে। মানুষ একটু নিঃশ্বাস নিতে চেয়েছে। মানুষ বলতে চেয়েছে, “এইভাবে আর নয়।”

SIR নিয়ে প্রশ্ন অবশ্যই থাকবে। ভোটার তালিকা থেকে যাঁরা বাদ গেছেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই প্রকৃত নাগরিক হতে পারেন। তাঁদের ভোটাধিকার চলে যাওয়ায় গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। মনে রাখতে হবে ভোটাধিকার কোনও দয়ার দান নয়। এটা নাগরিকের অধিকার। তাই বাদ পড়া মানুষের অধিকার কে কেউ ছোট করে দেখলে ভুল করবে। তাঁদের পরিচয়, নাগরিকত্ব এবং ভোটাধিকার দ্রুত ফিরিয়ে দিতে হবে।

তৃণমূল নেতৃত্ব ভেবেছিল, বিপুল সংখ্যক ভোটার ভোট দিতে পারবেন না বলে তাঁদের পরিবার ক্ষুব্ধ হবে। SIR প্রক্রিয়া নিয়ে নাগরিকদের বিরক্তি বিজেপির বিরুদ্ধে যাবে। ফলে বিজেপির ভোট কমবে এবং তৃণমূলের জয় আরো সহজ হবে। কিন্তু ভোটের অংকে সেই হিসেব মেলেনি।

যদি ধরে নেওয়া যায়, বাদ পড়া ভোটার দের প্রত্যেকে ভোট দিতেন এবং প্রত্যেকে তৃণমূল কেই ভোট দিতেন, তাহলে তৃণমূলের আসনসংখ্যা অনেক বেড়ে যেত। সেই অঙ্কে তৃণমূল সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি যেতে পারত, এমনকি সংখ্যাগরিষ্ঠতাও পেতে পারত। কিন্তু রাজনীতি শুধু সর্বোচ্চ সম্ভাবনার অঙ্কে চলে না। বাস্তব ভোটের আচরণ আলাদা কথা বলে।

আবার যদি ধরা যায়, সেই বাতিল ভোটাররা ২০২১ সালের আসনভিত্তিক ভোটের অনুপাতে ভোট দিতেন, তাহলে হিসেব অন্য দিকে ও যেতে পারত। কারণ যাঁরা ভোট দিতে পারেননি, তাঁরা সবাই তৃণমূলের ভোটার—এ কথা বলা যায় না। বাদ যাওয়া ভোটারদের মধ্যেও তৃণমূল সম্পর্কে ক্ষোভ থাকতে পারে। সেই দিক থেকে বিজেপির আরও কিছু আসন বাড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফলে SIR বড় ফ্যাক্টর হলেও সেটাই একমাত্র ফ্যাক্টর নয়। মানুষের মনের পরিবর্তন তার চেয়েও বড় ফ্যাক্টর।

এখানেই তৃণমূলের বড় ব্যর্থতা। তারা শেষ পর্যন্ত বুঝতে চায়নি, মানুষ শুধু প্রকল্পের টাকা দেখে ভোট দেয় না। মানুষ অপমানও মনে রাখে। মানুষ পাড়ার দাদার চোখরাঙানি মনে রাখে। মানুষ চাকরির বাজারে ছেলের ভেঙে পড়া মুখ দেখতে চায় না। বেকার ভাতার চেয়ে চাকরির নিশ্চয়তা সাধারণ মানুষের কাছে অনেক বেশি দামি। মানুষ হাসপাতালের লাইনে দাঁড়িয়ে প্রশাসনের ব্যর্থতা দেখেছে। মানুষ দেখেছে, দলের ঘনিষ্ঠ লোক ফুলে-ফেঁপে কলাগাছ হয়েছে, আর সাধারণ মানুষ ন্যায্য প্রাপ্যের জন্য দরজায় দরজায় ঘুরেছে।

এই জমা ক্ষোভ এই ভোটে ব্যালটে বিস্ফোরিত হয়েছে। যা সবটাই তৃণমূলের বিপক্ষে গেছে।

তাই বিজেপির জয়কে কেবল যান্ত্রিক ষড়যন্ত্রের ফল বললে ভুল হবে। আবার SIR-এর প্রশ্নকে উড়িয়ে দিলেও অন্যায় হবে। কারণ বহু মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সংখ্যালঘু মানুষও আছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক দের একাংশ মনে করছেন সংখ্যালঘু মানুষদের বৃহৎ অংশের ভোট তৃণমূলের দিকে যেতে পারত। সেটাও অনেক ক্ষেত্রে ঘটেনি।

তবুও শেষ কথা পরিষ্কার। তৃণমূলের এই বিপর্যয়ের জন্য SIR পুরোপুরি দায়ী নয়। এখানে দুটো সত্য পাশাপাশি দাঁড়ায়। একদিকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি আছে। অন্যদিকে তৃণমূলের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভও স্পষ্ট। SIR ফলের ওপর ছায়া ফেলেছে। কিন্তু রায়ের ভিত গড়েছে মানুষের ক্লান্তি, অপমানবোধ এবং পরিবর্তনের ইচ্ছা।


Scroll to Top