তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
নিরপেক্ষতা? প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

৫৮ লক্ষ ভোটারকে এবার ভোটার তালিকা থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে। ৩৩ লক্ষ ভোটার বিচারাধীনের তালিকায় রয়েছেন। যে ৫৮ লক্ষ ভোটারকে এবার ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হল, তাঁরা সবাই যে অবৈধ ভোটার তা কিন্তু নয়। এঁদের ভিতর অনেকেরই নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় রয়েছে। নির্বাচন কমিশন বলেছিল ২০০২ -এর ভোটার তালিকায় নাম থাকলে তাদের কোনো দুশ্চিন্তা নেই। সেকথা নির্বাচন কমিশন রাখেনি।

বিচারাধীন বা আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন এসব শব্দবন্ধ আর যে কটি রাজ্যে এসআইআর হয়েছে, সেখানে শোনা যায়নি। তাহলে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে কেন -- সে প্রশ্নের উত্তর নির্বাচন কমিশন অদ্যাবধি দেয়নি। বরং ৯১ লক্ষ ভোটারকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ রেখে একটি নির্বাচন করে ফেলল কমিশন। এই প্রভূত সংখ্যক ভোটারকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করা কতখানি সংবিধান সম্মত, কতখানিই বা ন্যায় সম্মত সে নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কমিশন সংবিধানের পাতা উল্টেও দেখার প্রয়োজন মনে করেনি। কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি শিবগননম বিচারাধীন ভোটারদের জন্য গঠিত ট্রাইবুনাল থেকে পদত্যাগ করেছেন। শিবগননম বলেছেন, এই কাজ করতে চার বছর লাগবে। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে একটি ভোটমুখী রাজ্যে তিন মাসের ভিতর এই এসআইআর করার তৎপরতা কেন। অভিযোগ এ-ও উঠেছে, নির্বাচন কমিশনের লক্ষ্য ছিল ডিলিশন, ইনক্লুশন নয়। কেন্দ্রের শাসক বিজেপিকে নির্বাচনে সুবিধা করে দিতেই এই ৯১ লক্ষ মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে মুছে দিতে চেয়েছে বিজেপি।

বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী সুপ্রিম কোর্টে বলেছেন, কোনো কেন্দ্রে যদি দেখা যায়, যত ভোটার বিচারাধীনের তালিকায় রয়েছেন তার থেকে জয় -পরাজয়ের ব্যবধানৎকম, তাহলে সেই কেন্দ্রের বিষয়টি ভেবে দেখা হবে। বিচারপতি বাগচী কী দেখবেন জানি না, তবে তৃণমূল কংগ্রেস এই নিয়ে ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে। এই রাজ্যে বহু কেন্দ্রেই দেখা গিয়েছে জয় - পরাজয়ের মার্জিনের থেকে বিচারাধীন ভোটারের সংখ্যা বেশি।
গত এক দশকে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিবৃতিতে বা তাদের বিভিন্ন কার্যকলাপে প্রমাণ করেছে, তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে। ২০২৪ -এর লোকসভা নির্বাচন বা তার পরবর্তীতে বেশ কয়েকটি রাজ্যসভা নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরাসরি ভোট কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগ মহারাষ্ট্রে উঠেছে, অন্ধ্রপ্রদেশে উঠেছে, বিহার, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ, দিল্লিতে উঠেছে।এখন পশ্চিমবঙ্গেও উঠেছে। এই অভিযোগ করেছেন কংগ্রেসের রাহুল গান্ধি, সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব, ডিএমকের স্ট্যালিন, তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু তাঁরা নন, পরকলা প্রভাকর,যোগেন্দ্র যাদবদের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং বিভিন্ন সংগঠনও বারেবারে সরব হয়েছে। এইসব অভিযোগের জবাব নির্বাচন কমিশন দেয়নি। বরং বারবার অভিযোগ উঠলেও নস্যাৎ করেছে।
তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নির্বাচন কমিশন সোনা মুখ করে মেনে নেবে এটা হয় না। নির্বাচন কমিশন এইসব অভিযোগ নস্যাৎ করবে, এটাই স্বাভাবিক। সেই স্বাভাবিক কাজটিই তারা করছে। কিন্ত কথায় আছে, অনেক সময় পচা শামুকেও পা কাটে। এবার এই রাজ্যে নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পর নির্বাচন কমিশন পচা শামুকে পা কেটে ফেলেছে।

এই রাজ্যের নতুন মুখ্যসচিবের দায়িত্ব নিয়েছেন মনোজ আগরওয়াল। এবার নির্বাচনপর্বে মনোজ আগরওয়াল ছিলেন এই রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক। ভোট পর্বে এই মনোজ আগরওয়ালকে দেখা গিয়েছিল নন্দীগ্রামে বিজেপি নেতাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে। যথারীতি অভিযোগ উঠেছিল। মনোজবাবু কর্ণপাত করেননি। ফল বেরনোর পর দেখা গেল রাজ্যের প্রথম ক্যাবিনেট মিটিংয়ে তিনি উপস্থিত। তখনও তিনি রাজ্যের মুখ্যসচিব হননি। তার আগেই মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক থাকার সময় তিনি ক্যাবিনেট বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারেন না। সেটা বেআইনি। অবশ্য আইন এখন কে-ই বা মানে। তবে এর চব্বিশ ঘণ্টার ভিতর মনোজবাবুকে রাজ্য সরকার মুখ্যসচিব নিযুক্ত করে দিল।এ যেন আম্পায়ার নিজেই জামা বদলে মাঠে নেমে পড়লেন।
শুধু মনোজ আগরওয়াল নন। এবার নির্বাচনে কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক ছিলেন সুব্রত গুপ্ত। তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে সুব্রতবাবুর সম্পর্ক ভালো ছিল না। তিনি দিল্লি চলে গিয়েছিলেন। একবছর আগে তিনি অবসর নিয়েছেন। তাঁকেই এবার ফিরিয়ে এনেছিল নির্বাচন কমিশন। ভোট মিটতেই তাঁকেই মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করা হল।
তৃতীয় ব্যক্তি আমলা সুরজিৎ রায়। ছিলেন নন্দীগ্রামের বিডিও। শোনা যায় শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল তাঁর। এবার নির্বাচনে তাঁকে সিনিয়র ডেপুটি সেক্রেটারি করা হয়েছে।
ভোট মিটতে না মিটতেই যেভাবে এঁদের সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করা হল, তা শুধু দৃষ্টিকটু নয়, প্রশাসনিক রীতিনীতিরও বিরোধী। ইতিপূর্বে কখনোই কোনো রাজ্যে নির্বাচন কমিশনের কর্তাদের তড়িঘড়ি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে বসানো হয়নি। তাহলে হঠাৎ এই ব্যতিক্রম কেন? সত্যিই কি নির্বাচন কমিশন তার নিরপেক্ষতা হারিয়ে ফেলেছে? কমিশনের কর্তাব্যক্তিদের ভোট মিটতেই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করার পক্ষে কিছু যুক্তি অবশ্যই কমিশন দেবে। তবে যা-ই উত্তর দিক না কেন, প্রশ্নটা কিন্তু ঘুরপাক খাবেই। আসলে গন্ধটা সত্যিই সন্দেহজনক।


Scroll to Top