তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরাজয় ও পদত্যাগ বিতর্ক

ভবানীপুর বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর পশ্চিমবঙ্গে এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গণনা প্রক্রিয়া শেষ হলেও রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে যাওয়ার পর আজকে বিকেল চারটের সাংবাদিক সম্মেলনে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি পরাজিত হননি, বরং ভোটলুট ও শক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে ফলাফল ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে তাঁর ইস্তফা দেওয়ার কোন প্রশ্নই নেই সাংবাদিক সম্মেলনে তাকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি সরাসরি জানিয়ে দেন যেহেতু তিনি পরাজিত হননি সেহেতু পদত্যাগ করার কোন প্রশ্ন আসে না। মমতার এই বক্তব্যের ফলে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে এক নতুন জল্পনা অনেকে মনে করছেন এটা একটা সাংবিধানিক সংকট কিন্তু এই পরিস্থিতিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ভবানীপুরে মমতা ব্যানার্জির পরাজয় শুধুমাত্র একজন পরাজিত নেত্রীর ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয় বরং গণতন্ত্রের মানদণ্ডে গণনার বৈধতা নিয়ে বড় সড় প্রশ্ন চিহ্ন তৈরি হয়েছে।

৪ মে ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, ভবানীপুর কেন্দ্রে শুভেন্দু অধিকারী ১৫,১০৫ ভোটে জয়ী হয়েছেন। কিন্তু এই জয়ের পরপরই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে সংবাদমাধ্যমে "ফোর্স এবং ম্যানিপুলেশন"-এর গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। তাই এই সন্দেহের বাতাবরণ।শুধুমাত্র রাজনৈতিক বাগযুদ্ধের মধ্যেই আর সীমাবদ্ধ নেই, এর পেছনে রয়েছে কিছু নির্দিষ্ট ঘটনা। ভবানীপুরের গণনায় হঠাৎ এক রহস্যময় বিরতি পড়ে। লাইভ আপডেট অনুযায়ী দেখা যায়, ১৩ রাউন্ড পর্যন্ত গণনা স্বাভাবিক থাকলেও এরপরই হঠাৎ সব থমকে যায়। তৃণমূলের দাবি, ঠিক সেই সময়েই তাদের এজেন্টদের জোরপূর্বক কাউন্টিং সেন্টার থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। দিনের শুরুতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এগিয়ে থাকলেও বিরতির পর ফলাফল নাটকীয় ভাবে বদলে যায়, যা সাধারণের মনেও প্রশ্নের উদ্রেক ঘটেছে।

এই প্রশ্নগুলি আরও জোরালো হচ্ছে কারণ নির্বাচনের আগে থেকেই স্ট্রং রুমের নিরাপত্তা ও সিসিটিভি নজরদারি নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে আসে। বারাসাতে স্ট্রং রুমের সিসিটিভি মনিটর ১৭ মিনিট অচল থাকার ঘটনা বা খুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রে "অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের" প্রবেশের অভিযোগ পরিস্থিতি কে আরও জটিল করে তুলেছে। যদিও নির্বাচন কমিশনের নথিতে স্ট্রং রুমের নিরাপত্তা, কাউন্টিং হলের ব্যবস্থা এবং ওয়েব কাস্টিং বাধ্যতামূলক, তবুও গণনার সময় বারবার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া বা লোডশেডিংয়ের মতো ঘটনা গুলো।কে হালকাভাবে নেওয়ার উপায় নেই।

এই সমস্ত কারণে টিএমসির কর্মী ও বেশ কিছু সাধারণ মানুষের মধ্যে অস্বস্তিকর প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। যেমন প্রতিটি বিধানসভা নির্বাচনের সময় শুধুমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গণনার ক্ষেত্রেই মাঝপথে কেন বারবার লোডশেডিং হয়? বিরতির পর ফলের ধারা কেন এভাবে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে ঘুরে যায়? শুভেন্দু অধিকারীই বা কিভাবে সকাল থেকেই বলে দিতে পারেন কোন রাউন্ডে কখন কি হবে এমনকি তিনি নির্দিষ্ট রাউন্ড ও বলে দেন কোন কোন রাউন্ডে তিনি পরাজিত হবেন এবং কোন রাউন্ড থেকে তিনি লিড নেবেন এবং এই ঘটনাগুলো কাকতলীয় ভাবে মিলে যাওয়ার ফলে অনেকেই একে স্ক্রিপটেড বলেছেন। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগছে শুভেন্দু অধিকারী বিজেপি সরকার গঠনের ব্যাপারে চরম আত্মবিশ্বাস কি কেবল তার রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো নিশ্চয়তা ? আমাদের জানা নেই তবে গণতন্ত্রে কেবল নিরপেক্ষ থাকা যথেষ্ট নয়, নিরপেক্ষতা কে বজায় রাখা এবং জনসমক্ষে দৃশ্যমান রাখা ও জরুরি।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও একটি ভয়াবহ অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, বিকেল তিনটের পর থেকে তাঁর দলের কর্মীদের মারধর করা শুরু হয়েছে বিজেপির কর্মীরা অনেক পার্টি অফিস দখল করছে এবং গণনা চলাকালীন তাকে এবং তার ইলেকশন এজেন্ট কেও শারীরিক ভাবে আঘাত করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন ওঠে সত্যিই সত্যিই কি শারীরিক ভাবি ওনাদের কে হেনস্থা করা হয়েছিল? লাইভ ফুটেজ বা সিসিটিভি লগ কী বলছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে হলে কেবল আবেগ দিয়ে নয়, প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অকাট্য প্রমাণের। কিন্তু এইরকম এক রাজনৈতিক বাতাবরণের ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করতে নারাজ এর ফলে এক নতুন সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হতে পারে । এই বিতর্ক তার দল টিএমসি কে কতটা মাইলেজ দেবে তা আমাদের জানা নেই তবে এটা যে একটা অপ্রত্যাশিত সমস্যা এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।

নিজের অস্তিত্ব বাঁচাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে রাজনৈতিক তাস টি বর্তমানে খেলছেন সেটা কতটা তার পক্ষে যাবে সেটাও বলা কঠিন কারণ এই নির্বাচনে তৃণমূলের এই বিপর্যয়কে কেবল 'কারচুপি' দিয়ে ব্যাখ্যা করলে ভোটের আসল সামাজিক বার্তাটি চাপা পড়ে যায় । বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা দুর্নীতি, বেকারত্ব সমস্যা, শাসন ক্লান্তি এবং মেরু করণের রাজনীতিও যে জনরায়ে প্রভাব ফেলেছে, তা অস্বীকার করা যায় না। তাই নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এ কথা ঠিক মমতা ব্যানার্জির আনা গণনা প্রক্রিয়ার ত্রুটিগুলো কে ফেলে দেওয়ার মতন নয়। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রেই মিথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই ক্ষেত্রে মানুষ কতটা বিশ্বাস বা ভরসা করবে তাতে সন্দেহ আছে। উল্টো দিকে মমতা ব্যানার্জির এই পদত্যাগ পত্র না দেওয়া সারা ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে এক নজিরবিহীন ঘটনায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল।


Scroll to Top